জগন্নাথ হলেন জগতের নাথ। সনাতন ধর্মে প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, এই কলিযুগে স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু মর্ত্যলোকে জগন্নাথ রূপে বিরাজ করছেন। পুরীর শ্রীক্ষেত্র হোক বা যেকোনো মন্দির— জগন্নাথ দেবের কেবল দর্শন (Darshan) করলেই অসীম পূণ্যলাভ হয় বলে মনে করা হয়। বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্র (Vedic Astrology) অনুযায়ী, আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও ভাগ্যের ওপর নবগ্রহ ও নক্ষত্রের গভীর প্রভাব রয়েছে। গ্রহের শুভ প্রভাবে যেমন জীবনে সৌভাগ্য আসে, তেমনই গ্রহের কুনজর বা অশুভ দশা মানুষকে একের পর এক কঠিন চ্যালেঞ্জের (Challenges) মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।
কোষ্ঠীর এই গ্রহদোষ দূর করার জন্য জ্যোতিষশাস্ত্রে অনেক জটিল ও ব্যয়বহুল টোটকা থাকলেও, সবচেয়ে সহজ এবং ভক্তিপূর্ণ উপায় হলো জগন্নাথ দেবের দর্শন। শাস্ত্র মতে, জগন্নাথ দেবের শ্রীঅঙ্গের বিভিন্ন অংশ দর্শনের মাধ্যমে নবগ্রহের অশুভ প্রভাব বা নেতিবাচকতা (Negativity) দূর করা সম্ভব। আসুন জেনে নেওয়া যাক, কোন গ্রহের অশুভ দশা কাটাতে মহাপ্রভুর কোন অঙ্গ দর্শন করবেন।
কোন অঙ্গে কোন গ্রহের মুক্তি?
সূর্য ও চন্দ্র: জ্যোতিষশাস্ত্র বলছে, জগন্নাথ দেবের ডান চোখ দর্শন করলে জন্মছকে বা কোষ্ঠীতে সূর্যের অশুভ প্রভাব কেটে যায় এবং সূর্যের মহাদশার (Mahadasha) কষ্ট লাঘব হয়। অন্যদিকে, মনের কারক গ্রহ চন্দ্রের অশুভ প্রভাব দূর করতে মহাপ্রভুর বাম চোখ দর্শন করা উচিত।
মঙ্গল গ্রহ: বৈদিক জ্যোতিষ মতে মঙ্গল হলো অত্যন্ত উগ্র ও রাগী গ্রহ (Fiery Planet)। জন্মছকে মঙ্গল অশুভ স্থানে থাকলে জীবন ছারখার হয়ে যেতে পারে। মঙ্গলের এই ক্ষতিকর প্রভাব দূর করতে জগন্নাথ দেবের শ্রীণাসিকা বা নাক দর্শন করার বিধান রয়েছে।
বুধ গ্রহ: বুধ দুর্বল হলে মানুষের জ্ঞান, শিক্ষা ও বুদ্ধিমত্তা লোপ পায়। জগন্নাথ দেবের মুখ ও ওষ্ঠাধর বা ঠোঁট দর্শন করলে বুধের অশুভ প্রভাব থেকে মুক্তি (Relief) মেলা সম্ভব।
বৃহস্পতি বা গুরুগ্রহ: দেবগুরু বৃহস্পতি দুর্বল হলে মানুষের ভাগ্য সাথ দেয় না এবং আর্থিক ক্ষতি (Financial Loss) হয়। বৃহস্পতির অশুভ প্রভাব দূর করতে জগন্নাথ দেবের কপালে সুশোভিত চন্দনের তিলক (Tilak) দর্শন করা অত্যন্ত ফলদায়ক।
শুক্র, শনি এবং রাহু-কেতুর দশা থেকে মুক্তি
শুক্র গ্রহ: শুক্র রুষ্ট হলে জীবন থেকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও বৈভব হারিয়ে যায়। শাস্ত্র অনুসারে, জগন্নাথ দেবের মুখের চার কোণ শুক্র গ্রহের প্রতিনিধিত্ব (Representation) করে। তাই মহাপ্রভুর মুখমণ্ডলের চারদিক দর্শন করলে শুক্রের কৃপা লাভ হয়।
শনির সাড়ে সাতি ও ধাইয়া: শনিদেবের সাড়ে সাতি (Sadesati) বা ধাইয়ার প্রকোপ অত্যন্ত কষ্টদায়ক। শনির প্রিয় রং কালো, আর জগন্নাথ দেবের গাত্রবর্ণও ঘোর কৃষ্ণ বা কালো। তাই শনি মহারাজের কুপ্রভাব থেকে বাঁচতে শ্রীজগন্নাথের কৃষ্ণবর্ণ শ্রীঅঙ্গ বা গাত্রবর্ণ দর্শন করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
রাহু ও কেতু: এই দুই ছায়া গ্রহ (Shadow Planets) মানুষের জীবনে আচমকা নানাবিধ বিপর্যয় নিয়ে আসে। রাহু-কেতুর এই কালবেলা থেকে রক্ষা পেতে জগন্নাথ দেবের মস্তকে সুশোভিত অপরূপ সোনালি মুকুট (Crown) দর্শন করা উচিত।
কলিযুগে ভক্তিই শ্রেষ্ঠ পথ। কোনো জাঁকজমকপূর্ণ পূজা-অর্চনা না করলেও, কেবল শুদ্ধ মনে জগন্নাথ দেবের এই বিশেষ অঙ্গগুলি দর্শন করলেই জীবনের সব গ্রহদোষ কেটে গিয়ে সুখ-শান্তি বজায় থাকে।