আমাদের জীবনযাত্রায় সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি বজায় রাখতে বাস্তুশাস্ত্রের (Vastu Shastra) ভূমিকা অপরিসীম। বৈদিক জ্যোতিষ ও বাস্তুবিজ্ঞান অনুযায়ী, মহাজাগতিক নবগ্রহের বিশেষ প্রভাব রয়েছে আমাদের বসতবাড়ির ওপর। বাড়ির প্রতিটি দিক এবং কোণ কোনো না কোনো নির্দিষ্ট গ্রহ এবং দেবদেবীর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই বাড়ির অন্দরসজ্জা বা নির্মাণ যদি শাস্ত্রসম্মত না হয়, তবে গ্রহদের কুনজরে পড়ে সংসারে অশান্তি ও বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
কোন কোণে কোন গ্রহ ও দেবতার বাস?
বাস্তুশাস্ত্র জানাচ্ছে, বাড়ির প্রতিটি দিকের একজন করে অধিপতি গ্রহ ও দেবতা রয়েছেন:
পূর্ব দিক: এই দিকটি শক্তির উৎস সূর্য (Sun) এবং দেবরাজ ইন্দ্রের স্থান।
উত্তর-পূর্ব দিক (ঈশান কোণ): এখানে অবস্থান করেন দেবগুরু বৃহস্পতি (Jupiter), ছায়া গ্রহ কেতু (Ketu), চন্দ্র এবং স্বয়ং মহাদেব।
উত্তর দিক: এটি বুধ (Mercury) গ্রহের দিক এবং এখানে অধিষ্ঠান করেন গণেশ, কুবের ও শ্রী বিষ্ণু।
উত্তর-পশ্চিম দিক: এই কোণটি পবন দেবের স্থান।
দক্ষিন দিক: এখানে অবস্থান পরাক্রমী মঙ্গল (Mars) এবং যমরাজের।
দক্ষিণ-পূর্ব দিক (আগ্নেয় কোণ): এটি শুক্র (Venus) গ্রহ এবং অগ্নিদেবের দিক।
পশ্চিম দিক: এই দিকটি কর্মফলের দেবতা শনির (Saturn) বাসস্থল।
দক্ষিণ-পশ্চিম দিক (নৈঋত কোণ): এই কোণটি ছায়া গ্রহ রাহু (Rahu) এবং গৃহ দেবতার স্থান। আর বাড়ির ঠিক কেন্দ্রস্থল বা ব্রহ্মস্থানে অধিষ্ঠান করেন স্বয়ং ব্রহ্মদেব।
বাড়ি ও জমির আকারের গুরুত্ব এবং বাস্তুদোষ
যেহেতু বাড়ির প্রতিটি কোণে বিভিন্ন গ্রহ ও দেবদেবীর শক্তি বিদ্যমান, তাই আদর্শ বাস্তুর জন্য সবকটি কোণ স্পষ্ট থাকা বাধ্যতামূলক। বাস্তুবিদদের মতে, এই কারণেই আয়তাকার (Rectangular) বা বর্গাকার জমি ও বাড়ি সবচেয়ে শ্রেয়। যদি জমি বা বাড়ির আকার চক্রাকার, ডিম্বাকার বা অর্ধচন্দ্রাকার হয়, তবে সবকটি কোণ স্পষ্ট ভাবে পাওয়া যায় না, যা তীব্র বাস্তুদোষ (Vastu Dosha) তৈরি করে।
বাড়ির নকশায় যদি কোনো একটি নির্দিষ্ট কোণ অনুপস্থিত (Missing) বা কাটা থাকে, তবে সেই কোণের অধিপতি গ্রহ ও দেবতা রুষ্ট হন। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনার বাড়িতে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকটি সঠিক নিয়মে না থাকে, তবে বাড়ির প্রধান বা মালিকের জন্মছকে (Horoscope) মারাত্মক পিতৃদোষ দেখা দিতে পারে এবং রাহুর অশুভ প্রভাব তাঁর ওপর পড়তে শুরু করে।
কেরিয়ার ও জীবনের ওপর রাহুর কুপ্রভাব
বাস্তুশাস্ত্রে দক্ষিণ-পশ্চিম দিককে ধরিত্রী ও ভূমির প্রতীক বা আর্থ এলিমেন্ট (Earth Element) বলে মনে করা হয়। এই কোণটি কেটে বাদ গেলে বা কোনো কারণে অনুপস্থিত থাকলে জাতকের জীবনে স্থায়িত্ব চলে যায়। এর ফলে তীব্র মানসিক অস্থিরতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং কেরিয়ারে (Career) পদে পদে বাধা আসে। যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও চাকরি পেতে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা হয়, শারীরিক অসুস্থতা বাড়ে এবং জাতককে নানাভাবে কষ্ট ভোগ করতে হয়।
এমনকি বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম দিকটি ত্রুটিপূর্ণ হলে মালিকের কোষ্ঠীতে রাহুর মহাদশা বা অন্তর্দশা (Antardasha) সক্রিয় হয়ে ওঠে। শুধু দিক কাটা থাকাই নয়, এই কোণটিকে যদি সবসময় অপরিচ্ছন্ন বা নোংরা করে রাখা হয়, তাহলেও রাহুর নেতিবাচক প্রভাব (Negative Effect) বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তাই ঘর তৈরির সময় দিক ও কোণের এই ভারসাম্য বজায় রাখা একান্ত জরুরি।