বর্তমান সময়ে শহুরে নাগরিক জীবনে (urban life) বহুতল ফ্ল্যাটের ভিড়ে নিজস্ব উঠোন ক্রমশ বিলুপ্তপ্রায়। আধুনিক আবাসন সংস্কৃতিতে (flat culture) এখন আর খোলামেলা উঠোনের জায়গা থাকে না। তবে গ্রামীণ জীবনে (rural life) বা নিজস্ব জমিতে তৈরি বাড়িতে এখনও উঠোনের চল রয়েছে। ভারতীয় সংস্কৃতিতে (Indian culture) প্রাচীনকাল থেকেই বাড়ির উঠোনকে অত্যন্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাস্তুশাস্ত্র (Vastu Shastra) অনুযায়ী, বাড়িতে যদি উঠোন থাকে, তবে তার সঙ্গে জড়িত কিছু জরুরি নিয়ম মেনে চলা আবশ্যক। কারণ, উঠোনের বাস্তু সঠিক না হলে সংসারে নিত্যদিনের অশান্তি, পারিবারিক কলহ এবং চরম আর্থিক ক্ষতি (financial loss) দেখা দিতে পারে।
বাস্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত চার ধরনের উঠোন দেখা যায়— বাড়ির সামনের অংশ, পিছনের অংশ, সামনে ও পিছনে উভয় দিক এবং একদম বাড়ির মাঝখানে অবস্থিত উঠোন। প্রতিটি অবস্থানের জন্যই রয়েছে পৃথক বাস্তু নিয়ম।
কোন দিকে উঠোন থাকা সবচেয়ে শুভ?
দিক অনুসারে বিচার করলে উত্তরমুখী (north-facing) উঠোনকে সবচেয়ে শুভ ও মঙ্গলদায়ক মনে করা হয়। এছাড়া পূর্ব দিকের (east side) উঠোনও পরিবারে ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে আসে। পশ্চিম দিকের উঠোনকে মাঝারি ফলদায়ক বলে মনে করা হয়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: যদি বাড়ির ঠিক মাঝখানে উঠোন থাকে, তবে তার উত্তর দিকে পুজোর ঘর (prayer room) এবং আগ্নেয় কোণে অর্থাৎ দক্ষিণ-পূর্ব দিকে রান্নাঘর (kitchen) তৈরি করা উচিত।
কেন্দ্রস্থলের গুরুত্ব ও ‘ব্রহ্মস্থান’
বাড়ির ঠিক মাঝখানে অবস্থিত উঠোনকে বাস্তুশাস্ত্রে ‘ব্রহ্মস্থান’ (centre of energy) বলা হয়। এই স্থানটি সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, উন্মুক্ত এবং পরিপাটি করে রাখা উচিত। ব্রহ্মস্থানে কোনোভাবেই কোনো অগোছালো বা ভাঙাচোরা জিনিস রাখা যাবে না, এতে ইতিবাচক শক্তি (positive energy) বাধাগ্রস্ত হয়।
উঠোনের গঠন কেমন হওয়া উচিত?
বাস্তুমতে উঠোনের গঠনশৈলীও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি উঠোনের মাঝখানের অংশটি নিচু এবং চারপাশ উঁচু হয়, তবে তা অশুভ লক্ষণ বলে ধরা হয়। এর বিপরীত, অর্থাৎ চারদিক থেকে সামান্য ঢালু হয়ে মাঝখানের অংশটি যদি অপেক্ষাকৃত উঁচু থাকে, তবে তা সংসারে শুভ ফল নিয়ে আসে। বর্তমান যুগে উঠোন পাকা (concrete flooring) করার প্রবণতা বাড়লেও, বিয়ে বা যেকোনো শুভ অনুষ্ঠানের কথা মাথায় রেখে উঠোনের সামান্য অংশ কাঁচা বা মাটি রাখা ভালো।
ইতিবাচক শক্তির জন্য উঠোনে কী রাখবেন?
বাড়ির পরিবেশকে মনোরম ও নেতিবাচকতা মুক্ত রাখতে উঠোনে সুগন্ধি ফুলের গাছ লাগানোর পরামর্শ দেয় বাস্তুশাস্ত্র। চাঁপা, রজনীগন্ধা, শিউলি বা জুঁই ফুলের সুবাস কেবল পরিবেশকেই শুদ্ধ করে না, পাশাপাশি দাম্পত্য জীবনে (married life) ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
এছাড়া স্বাস্থ্য ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে উপকারী কিছু গাছ যেমন— ডালিম, পেয়ারা বা কারিপাতা লাগানো যেতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তুলসী গাছ (holy basil)। তুলসী গাছকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করা হয়, যা চারপাশের বাতাসকে শুদ্ধ করে এবং নেতিবাচক শক্তি (negative energy) দূর করে। বাস্তুমতে, উঠোনের ঠিক মাঝখানে একটি উঁচু বেদি বা বড় টবে তুলসী গাছ রোপণ করা সবচেয়ে কল্যাণকর।
পাশাপাশি, প্রতিদিন সকালে বা সন্ধ্যায় বাড়ির প্রবেশদ্বার (entrance) এবং উঠোনে আলপনা বা রঙ্গোলি আঁকার বিশেষ ঐতিহ্য রয়েছে। বিশ্বাস করা হয়, এতে দেবী লক্ষ্মীর কৃপা বজায় থাকে এবং বাড়ির অভ্যন্তরীণ বাস্তুদোষের নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই কেটে যায়।