সনাতন বা হিন্দুধর্মের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে কর্মফল, আত্মা এবং জন্মান্তরবাদের ওপর। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, মৃত্যুর মাধ্যমে কেবল নশ্বর দেহের বিনাশ ঘটে, কিন্তু আত্মা (Soul) চিরকাল অবিনশ্বর ও অমর থাকে। সনাতন ধর্মের অন্যতম পবিত্র গ্রন্থ ‘গরুড় পুরাণ’-এ মৃত্যুর পরবর্তী পর্যায় ও আত্মার গতিবিধি সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া রয়েছে। এই পুরাণ অনুযায়ী, দেহত্যাগের পরপরই কোনো আত্মা সম্পূর্ণভাবে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে পারে না। বরং মায়ার টানে পরবর্তী বেশ কিছুদিন সে নিজের বাড়ি এবং পরিবারের সদস্যদের আশপাশেই ঘোরাফেরা করে।
কবে এবং কেন ফিরে আসে আত্মা?
মৃত ব্যক্তির আত্মার চিরশান্তি ও সদগতির জন্য হিন্দু ধর্মে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার ও বিধিনিষেধ পালনের কথা বলা হয়েছে। শাস্ত্রীয় নিয়মগুলো ভক্তিভরে পালন করলে আত্মা তৃপ্ত হয় এবং পরলোকের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার আগে তার উত্তরসূরিদের ওপর আশীর্বাদ (Blessings) বর্ষণ করে।
প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, মৃত্যুর পর ‘তেরো দিন’ বা ১৩তম দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ (Significant)। বলা হয়ে থাকে, মর্ত্যলোক বা ইহলোক চিরতরে ত্যাগ করার আগে এই বিশেষ দিনটিতেই আত্মা শেষবারের মতো নিজের ঘর এবং প্রিয়জনদের দেখতে ফিরে আসে। এই কারণেই সনাতন নিয়মে ১৩তম দিনে শ্রদ্ধার সঙ্গে পিণ্ডদান (Pind Daan) ও ব্রাহ্মণ ভোজন (Brahman Bhojan) করানোর বিধান রয়েছে, যা আত্মাকে পরলোকের পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
আত্মার শান্তির জন্য এই সময় কী করবেন না?
মৃত্যুর পর প্রথম ১৩ দিন একটি আত্মার জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক ও কঠিন সময়। কারণ, যে পরিবার এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির সঙ্গে সে সারাজীবন জড়িয়ে ছিল, তা এক নিমেষে ছেড়ে যাওয়া সহজ হয় না। তাই এই সময়ে কিছু বিষয়ে কঠোর সতর্কতা (Precautions) অবলম্বন করা উচিত:
-
শান্ত পরিবেশ: ১৩তম দিনে বাড়ির পরিবেশ সম্পূর্ণ শুদ্ধ ও শান্ত রাখা জরুরি। পরিবারের সদস্যদের এই সময় যেকোনো ধরনের ঝগড়াঝাঁটি, রাগারাগি বা অশালীন ভাষা ব্যবহার থেকে দূরে থাকা উচিত।
-
পরিচ্ছন্নতা: অশৌচ চলাকালীন ঘরবাড়ি নোংরা বা অগোছালো করে রাখা শাস্ত্র বিরোধী। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ইতিবাচকতা বজায় রাখে।
-
কান্নাকাটি ও নাম ধরে ডাকা: মৃত ব্যক্তির জন্য শোক হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু শাস্ত্রমতে গভীর রাতে একা একা কাঁদা এবং বারবার তাঁর নাম ধরে ডাকা অত্যন্ত অশুভ (Inauspicious)। বিশ্বাস করা হয়, এতে আত্মার মোহ আরও বেড়ে যায় এবং সে বাড়ি ছেড়ে পরলোকে যাওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলে।
এই সমস্ত ধর্মীয় ও পারলৌকিক বিধি-আচার অঞ্চল বা পরিবার ভেদে কিছুটা ভিন্ন (Different) হতে পারে। আধুনিক ব্যস্ত জীবনে অনেকের পক্ষেই হয়তো সব নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করা সম্ভব হয় না। তবে আচার যাই হোক না কেন, মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত যাতে কোনোভাবেই প্রয়াত মানুষের প্রতি অবহেলা বা অশ্রদ্ধা প্রকাশ না পায়।