শৈশব থেকেই আমরা বাড়ির বড়দের মুখে শুনে আসছি যে, সন্ধ্যার সময় অকারণে কান্নাকাটি, ঝগড়া বা কোনো রকমের অশান্তি করতে নেই। সনাতন ধর্মে প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, দিনের এই বিশেষ সন্ধিক্ষণে গৃহকোণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি থাকে। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, সন্ধ্যাবেলাকে অত্যন্ত শুভ এবং ইতিবাচক শক্তির (Positive Energy) প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। তাই এই সময়ে মন শান্ত রাখা, ভালো চিন্তা করা এবং পরিবারের সকলের মধ্যে সৌহার্দ্য বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু এই বিশ্বাসের পেছনে আসল ধর্মীয় ও জ্যোতিষশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যাটি কী, তা জানা আছে কি?
মা লক্ষ্মীর আগমন ও অলক্ষ্মীর বিদায়
হিন্দু ধর্মে গোধূলি লগ্ন বা দিন ও রাতের মিলনক্ষণকে অত্যন্ত পবিত্র সময় বা 'সন্ধিক্ষণ' হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মনে করা হয়, এই সময়ে ধন-সম্পদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মা লক্ষ্মী মর্ত্যলোকে বিচরণ করেন এবং মানুষের গৃহে প্রবেশ করেন। দেবী কেবল সেই সমস্ত বাড়িতেই অধিষ্ঠান করেন, যেখানে পরিচ্ছন্নতা, শান্তি এবং দেবভক্তি বিরাজ করে।
যে সংসারে সন্ধ্যার সময় অনর্থক কান্নাকাটি, চিৎকার, চেঁচামেচি বা অশান্তি হয় এবং যেখানে আলস্য ও নোংরা পরিবেশ থাকে, সেখানে মা লক্ষ্মী প্রবেশ করেন না। ফলস্বরূপ, সেই গৃহ অলক্ষ্মীর চারণভূমিতে পরিণত হয় এবং পরিবারটি তীব্র আর্থিক সমস্যায় (Financial Crisis) জড়িয়ে পড়তে পারে। এই কারণেই মূলত সন্ধ্যায় অশান্তি করতে কঠোরভাবে বারণ করা হয়।
জ্যোতিষশাস্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি
জ্যোতিষশাস্ত্র (Astrology) অনুযায়ী, সন্ধ্যার সময় অতিরিক্ত দুঃখ প্রকাশ, কান্না বা মানসিক অস্থিরতা ঘরের নেতিবাচক শক্তিকে (Negative Energy) বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর সরাসরি কুপ্রভাব পড়ে জন্মছকের দুটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রহ— চন্দ্র ও শুক্রের ওপর।
চন্দ্র গ্রহ: চন্দ্রকে মানুষের মনের কারক গ্রহ ধরা হয়। সন্ধ্যার সময় মন খারাপ করলে বা কাঁদলে চাঁদের শুভ প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে জাতকের মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা (Anxiety) আরও বৃদ্ধি পায়।
শুক্র গ্রহ: শুক্র হলো সুখ, সমৃদ্ধি, বৈভব ও আর্থিক সচ্ছলতার প্রতীক। গোধূলি বেলায় নেতিবাচক আবেগে নিমজ্জিত থাকলে শুক্র গ্রহ রুষ্ট হয় এবং জীবনে অর্থসংক্রান্ত সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
সন্ধ্যাবেলার পালনীয় ও বর্জনীয় নিয়মাবলি
সংসারে সুখ-সমৃদ্ধির জোয়ার আনতে সন্ধ্যায় কিছু কাজ করা যেমন অত্যন্ত শুভ, তেমনই কিছু কাজ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা বর্জনীয়:
কী করা শুভ?
বাড়ির মূল প্রবেশদ্বারের (Main Entrance) কাছে একটি ঘি বা সর্ষের তেলের প্রদীপ জ্বালানো।
হাত-মুখ ধুয়ে বা স্নান করে শুদ্ধ হয়ে ঈশ্বরের আরাধনা ও আরতি (Prayer) করা।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে হাসিমুখে ও আনন্দে সময় কাটানো।
কী করা অশুভ?
ঘুমানো: সন্ধ্যার সময় ঘুমানো উচিত নয়, এতে স্বাস্থ্য ও আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটে।
ঝাড়ু দেওয়া: এই সময়ে ঘর ঝাড়ু দিলে মা লক্ষ্মী অসন্তুষ্ট হন এবং আকস্মিক অর্থহানি (Loss of money) হতে পারে।
লেনদেন: গোধূলি লগ্নে কাউকে টাকা, দুধ, দই বা লবণ ধার দেওয়া অত্যন্ত অশুভ।
অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা: এই সময়ে চুল বা নখ কাটা এবং তুলসী গাছে জল দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। এছাড়া, বাড়ির দরজার চৌকাঠে (Threshold) বসে থাকা নিষিদ্ধ, কারণ এতে লক্ষ্মীর গৃহপ্রবেশে বাধা সৃষ্টি হয়।