বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী শ্রাবণ মাসের সূচনা হতেই বিশ্বজুড়ে ভোলেনাথের ভক্তদের মধ্যে এক বিশেষ উন্মাদনা দেখা যায়। মহাদেবের পরম প্রিয় এই পবিত্র মাসে ভক্তরা এক ঘটি জল আর বেলপাতা নিয়েই পৌঁছান শিবালয়ে। মনে করা হয়, নিখিল বিশ্বের প্রতিটি অণু-পরমাণুতে দেবাদিদেব মহাদেব অধিষ্ঠান করছেন। আর তাই মাত্র এক ঘটি জলেই জীবনের সব জটিল সমস্যার সমাধান মেলে। তবে শিবলিঙ্গে জল ঢালার পাশাপাশি যদি তাঁর প্রিয় মহামন্ত্র জপ করা যায়, তবে ভক্তের ওপর দেবাদিদেবের অশেষ কৃপা বর্ষিত হয়।
কিন্তু কীভাবে সৃষ্টি হলো এই অলৌকিক ‘ওম নমহঃ শিবায়’ (Om Namah Shivaya) মন্ত্রের? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে সনাতন ধর্মের অন্যতম প্রধান গ্রন্থ শিব পুরাণে (Shiva Purana)।
শিব পুরাণ অনুযায়ী মহামন্ত্রের উৎপত্তি
শিব পুরাণের কথামুখ অনুযায়ী, একবার ব্রহ্মা ও বিষ্ণু মহাদেবের কাছে সৃষ্টির মূল পাঁচ তত্ত্ব বা কাজ সম্পর্কে জানতে চান। মহাদেব তাঁদের জানান— উৎপত্তি, পালন বা ভরণ-পোষণ, ধ্বংস, তিরোভাব বা হারিয়ে যাওয়া এবং মোক্ষ বা মুক্তি— এই পাঁচটিই হলো নিখিল সংসারের মূল ভিত্তি। মাটি বা ক্ষিতিতে সৃষ্টি হয়, জলে পালিত হয়, আগুনে ধ্বংস ঘটে, বাতাসে তা বিলীন হয় এবং আকাশে মুক্তি মেলে। দেবধিদেব তাঁর পঞ্চমুখ দিয়ে এই পাঁচটি মহাজাগতিক দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
‘ওম’ ধ্বনি এবং পঞ্চাক্ষর মন্ত্রের তত্ত্ব
মহাদেবের চতুর্দিকে চারটি মুখ এবং ঠিক কেন্দ্রস্থলে পঞ্চম মুখ অবস্থিত। তাঁর প্রথম মুখাবয়ব থেকে যে প্রণব ধ্বনির নির্গমন ঘটে, তা-ই হলো ‘ওম’ (Om)। এই ধ্বনি স্বয়ং মহাদেবের উপস্থিতির প্রতিনিধিত্ব (Representation) করে। যে ব্যক্তি নিয়মিত এই ধ্বনি উচ্চারণ করেন, তাঁর হৃদয়ে সর্বদাই মহাদেব বিরাজ করেন।
অন্যদিকে, ‘ন-ম-শি-বা-য়’— এই পাঁচটি অক্ষরের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে মহাদেবের পঞ্চাক্ষর মন্ত্র (Panchakshara Mantra)। এর প্রতিটি ধ্বনি প্রকৃতির পঞ্চভূতকে (Five Elements) নির্দেশ করে:
‘ন’: মাটির প্রতীক
‘ম’: জলের প্রতীক
‘শি’: অগ্নির প্রতীক
‘বা’: বায়ুর প্রতীক
‘য়’: মহাশূন্য বা আকাশের প্রতীক
আমাদের দেহ গঠনকারী পঞ্চভূত— ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোমের সঙ্গে এই পাঁচটি ধ্বনির মেলবন্ধন ঘটিয়ে জপ করলে শরীরের সুপ্ত ইতিবাচক শক্তি বা এনার্জি (Energy) জাগ্রত হয়।
মন্ত্র জপের জাদুকরী উপকারিতা
শ্রাবণ মাসের সোমবারে একমনে ‘ওম নমহঃ শিবায়’ জপ করলে তা পূর্ণাঙ্গ শিব পূজার সমতুল্য পুণ্য দান করে। এই জপের ফলে:
মনের গভীর অস্থিরতা দূর হয়ে পরম মানসিক শান্তি (Mental Peace) অর্জিত হয়।
মানসিক চাপ ও নেতিবাচক চিন্তাভাবনা দূর হয়ে আত্মবিশ্বাস (Self-confidence) বৃদ্ধি পায়।
জীবনের যাবতীয় পাপ স্খলন ঘটে এবং মনোবাসনা পূর্ণ হয়।